সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দেবী পীঠকথা (Devi Peeth Katha)

 ভূমিকা :

|| একান্ন পীঠে মহামায়ার চিরন্তন বিস্তার ||

 


ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম, আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে…”—এই কাব্যিক অনুভূতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গভীরতা। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল একান্ন শক্তিপীঠ, যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি চেতনার এক অমূল্য প্রতীক।

পুরাণ মতে, দেবী সতী- দেহাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়েছিল, যখন ভগবান শিব তাঁর প্রিয়াকে কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছিলেন। সেই দেহাংশের প্রতিটি পতনস্থলই পরবর্তীকালে শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়। মোট ৫২টি এই পবিত্র স্থান ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি ভারতবর্ষের বাইরেওযার মধ্যে একটি পীঠ গুপ্ত বা অপ্রকাশিত বলেও ধরা হয়। যেখানে প্রতিটি পীঠ মায়ের এক একটি রূপ শক্তির প্রতীক।

এই শক্তিপীঠগুলির মধ্যে চারটিআদি শক্তিপীঠবিশেষ মর্যাদা লাভ করেছেঅসমের কামরূপ কামাখ্যা মন্দির, উত্কলের বিমলা মন্দির, কলকাতার কালিঘাট কালী মন্দির এবং ওড়িশার গঞ্জাম জেলার পুরুষোত্তমপুরে অবস্থিত তারা তারিণী মন্দির। এই চারটি পীঠে মহামায়ার আদিশক্তির বিশেষ প্রকাশ দেখা যায়।গঙ্গা, যমুনা, ভাগীরথীর তীর থেকে শুরু করে ভারতের বাইরের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে রয়েছে এই পবিত্র পীঠগুলি। প্রতিটি শক্তিপীঠ মায়ের এক একটি রূপ, এক একটি শক্তির প্রতীকযেখানে ভক্তি, আস্থা বিশ্বাস একসূত্রে গাঁথা। আজও এই একান্ন শক্তিপীঠ আমাদের সংস্কৃতি, সাধনা আধ্যাত্মিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মনে করিয়ে দেয়মায়ের শক্তি সর্বত্র, সর্বব্যাপী, চিরন্তন।

বিভিন্ন পুরাণযেমন তন্ত্রচূড়ামণি, দেবী ভাগবত, শিব পুরাণ, কালিকা পুরাণ কামাখ্যা তন্ত্রএই সমস্ত ধর্মগ্রন্থেই শক্তিপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গ থেকেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠেশক্তিপীঠ উপপীঠ আসলে কী?

পুরাণ অনুযায়ী, দেবী সতী- দেহাংশ যেখানে যেখানে পতিত হয়েছে, সেই স্থানগুলিকেই শক্তিপীঠ বলা হয়। অর্থাৎ, মায়ের তনুর অঙ্গ পতনের ফলে যে পবিত্র স্থানের সৃষ্টি, সেগুলিই প্রকৃত শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, উপপীঠ হল সেই স্থানগুলি, যেখানে দেবীর দেহাংশ নয়, বরং তাঁর অলঙ্কারযেমন গয়না, আংটি, কুণ্ডল, নূপুর বা অন্যান্য শৃঙ্গার সামগ্রী পতিত হয়েছে। এই স্থানগুলিও সমানভাবে পবিত্র, কারণ সেগুলিও মায়ের সত্তারই এক বিশেষ বহিঃপ্রকাশ বহন করে।

একটু গভীরভাবে ভাবলেই বোঝা যায়একজন নারীর দেহে যেমন নানা অঙ্গ থাকে, তেমনি তাঁর অলঙ্কারের সংখ্যাও কম নয়। ফলে দেবীর দেহাংশ অলঙ্কারের পতনস্থল একত্রে গণনা করলে সংখ্যাটি ৫১-এর অনেক বেশি হয়ে যেতে পারেএমনকি ১০৮ পর্যন্ত পৌঁছনোও অসম্ভব নয়। তবুও শাস্ত্র অনুযায়ী ৫১ শক্তিপীঠের কথাই প্রধানভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গণনায় শক্তিপীঠ উপপীঠউভয়কেই একত্রে বিবেচনা করা হয়েছে, যা আমাদের ধর্মীয় পরম্পরায় একটি নির্দিষ্ট স্বীকৃত রূপ পেয়েছে।

একান্ন পীঠ তাই কেবল তীর্থ নয় মহামায়ার চিরন্তন শক্তির বিস্তার, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মা সর্বত্র, সর্বকালে, সর্বশক্তিময়ী।

                                                                                                        পরবর্তী পর্ব: উৎকলে দেবী বিমলা।

মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

  শিবপুরাণ অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের কাহিনি শিব পুরাণ অনুযায়ী শক্তিপীঠের সৃষ্টি শুধুমাত্র সতীর দেহাংশ পতনের একটি পৌরাণিক ঘটনা নয় ; এটি গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। শক্তিপীঠ কেবল ভৌগোলিক স্থান নয় ; এগুলি দেবীশক্তির প্রকাশকেন্দ্র। সতীর দেহের প্রতিটি অংশ মহাশক্তির বিভিন্ন রূপকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। শক্তি ও শিব অবিচ্ছেদ্য, শিব চেতনার পরম তত্ত্ব , আর দেবী সতী সেই চেতনার শক্তিরূপ।   শিব   ও   শক্তি   পরস্পর   অবিচ্ছেদ্য। শিবপুরাণে বর্ণিত আছে যে, প্রজাপতি দক্ষ ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। তাঁর কন্যা সতী, মহাদেব শিবকে স্বামীরূপে গ্রহণ করলেও দক্ষ কখনও শিবকে সম্মান করতেন না। কারণ শিব ছিলেন বৈরাগী, ভস্মমণ্ডিত, অলৌকিক স্বভাবের দেবতা— যা দক্ষের রাজসিক অহংকারের সঙ্গে মেলে না। একসময় প্রজাপতি দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে দেবতা, ঋষি ও গন্ধর্বসহ সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শিব ও সতীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কৈলাসে বসে দেবী সতী যখন দেবতাদের যজ্ঞে যেতে দেখলেন, তখন তাঁ...
|| আজকের জীবনে শক্তিপীঠের সঙ্গে সম্পর্ক ||  শক্তিপীঠের মূল কাহিনি হলো শোক , বিচ্ছেদ এবং পুনর্গঠন। সতীর দেহত্যাগ, মহাদেবের গভীর শোক, সেই শোক থেকে নতুন তীর্থের সৃষ্টি,   মানুষের জীবনেও সম্পর্কভঙ্গ , মৃত্যু , ব্যর্থতা বা মানসিক আঘাত আসে। শক্তিপীঠের কাহিনি মনে করিয়ে দেয় জীবনের ভাঙনও নতুন অর্থ , শক্তি এবং আত্মজাগরণের উৎস হতে পারে। আবার অন্য দিকে আমরা দেখতে পাই ... “ শক্তি ” মানে সৃষ্টিশীল শক্তি , সাহস , জ্ঞান , করুণা ও রূপান্তরের ক্ষমতা। শক্তিপীঠ আমাদের মনে করায় যে নারীত্ব কেবল সামাজিক ভূমিকা নয় ; তা মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক। তাই নারী সম্মান, নারী শিক্ষা , আত্মমর্যাদা , সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব থাকা খুব জরুরি। পরিশেষে বলা বাহুল্য , আজকের জীবনে শক্তিপীঠের গুরুত্ব মূলত আধ্যাত্মিক , প্রতীকী এবং সাংস্কৃতিক। এগুলিকে কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনার স্মারক হিসেবে নয় , বরং মানুষের অন্তর্জীবনের গভীর সত্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে শক্তিপীঠের দর্শন নারীত্বকে মহাশক্তির রূপে প্রতিষ্ঠা করে। এ...