শিবপুরাণ অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের কাহিনি
শিব পুরাণ অনুযায়ী শক্তিপীঠের সৃষ্টি শুধুমাত্র সতীর দেহাংশ পতনের একটি পৌরাণিক ঘটনা নয়; এটি গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। শক্তিপীঠ কেবল ভৌগোলিক স্থান নয়; এগুলি দেবীশক্তির প্রকাশকেন্দ্র। সতীর দেহের প্রতিটি অংশ মহাশক্তির বিভিন্ন রূপকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। শক্তি ও শিব অবিচ্ছেদ্য, শিব চেতনার পরম তত্ত্ব, আর দেবী সতী সেই চেতনার শক্তিরূপ। শিব ও শক্তি পরস্পর অবিচ্ছেদ্য।
শিবপুরাণে বর্ণিত আছে যে, প্রজাপতি দক্ষ ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। তাঁর কন্যা সতী, মহাদেব শিবকে স্বামীরূপে গ্রহণ করলেও দক্ষ কখনও শিবকে সম্মান করতেন না। কারণ শিব ছিলেন বৈরাগী, ভস্মমণ্ডিত, অলৌকিক স্বভাবের দেবতা— যা দক্ষের রাজসিক অহংকারের সঙ্গে মেলে না।
একসময় প্রজাপতি দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে দেবতা, ঋষি ও গন্ধর্বসহ সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শিব ও সতীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
কৈলাসে বসে দেবী সতী যখন দেবতাদের যজ্ঞে যেতে দেখলেন, তখন তাঁর মনে পিতৃগৃহে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে। মহাদেব শিব সতীকে সতর্ক করে বলেন যে, যেখানে অপমানের সম্ভাবনা থাকে সেখানে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু সতী পিতার গৃহে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন।
যজ্ঞসভায় পৌঁছে সতী দেখলেন, কেউ তাঁকে যথাযোগ্য সম্মান দিচ্ছে না। প্রজাপতি দক্ষ প্রকাশ্যে মহাদেব শিবের নিন্দা ও অপমান করতে থাকেন। স্বামীর এই অপমান সহ্য করতে না পেরে সতী গভীর বেদনায় বলেন যে, যে দেহ দক্ষের কন্যারূপে জন্ম নিয়েছে, সেই দেহ ধারণ করা তাঁর পক্ষে অসম্মানের। এরপর তিনি যোগাগ্নির মাধ্যমে নিজের দেহ ত্যাগ করেন।
এই সংবাদ কৈলাসে পৌঁছালে মহাদেব ভয়ংকর ক্রোধে জটাজুট আছড়ে বীরভদ্র ও ভদ্রকালীর সৃষ্টি করেন। তাঁদের আদেশ দেওয়া হয় দক্ষযজ্ঞ ধ্বংস করার জন্য। বীরভদ্র যজ্ঞসভায় গিয়ে সমস্ত আয়োজন ভেঙে দেন এবং দক্ষের মস্তক ছিন্ন করেন।
পরে দেবতাদের প্রার্থনায় মহাদেবের ক্রোধ শান্ত হয়। তিনি দক্ষকে পুনর্জীবন দান করেন, তবে ছাগলের মস্তক সংযুক্ত করে। দক্ষ তখন নিজের ভুল উপলব্ধি করে মহাদেবের স্তব ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেন।
সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব শোকাকুল হয়ে তাঁর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বময় বিচরণ করতে থাকেন। তখন ভগবান বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ খণ্ডিত করেন। দেবীর অঙ্গ যেখানে যেখানে পতিত হয়, সেখানেই গড়ে ওঠে পবিত্র শক্তিপীঠসমূহ।
পরবর্তী পর্ব: উৎকলে দেবী বিমলা।




মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন