সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ব্রহ্মসংহিতা- Brahma Samhita Slokas

 ব্রহ্মসংহিতা


আজকে আমি আপনাদের সামনে আনতে চলেছি ব্রহ্মসংহিতা-তে উল্লিখিত এক অপূর্ব মধুর শ্লোক—

“ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দ বিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্ গোবিন্দঃ সর্বকারণকারণম্ ॥”

পরম ঈশ্বর হলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাঁর দিব্য রূপ সৎ (চিরন্তন), চিৎ (চেতনাময়) এবং আনন্দময়। তিনি অনাদি, অর্থাৎ তাঁর কোনো শুরু নেই; অথচ তিনিই আবার সকল সৃষ্টির আদি কারণ। সেই গোবিন্দই সমগ্র জগতের “সর্বকারণের কারণ” — সমস্ত সৃষ্টি, শক্তি ও অস্তিত্বের মূল উৎস।

চিন্তামণি-প্রকর-সদ্মসু কল্পবৃক্ষ-
লক্ষাবৃতেষু সুরভীরভিপালয়ন্তম্ ।
লক্ষ্মী-সহস্র-শত-সম্ভ্রম-সেব্যমানং
গোবিন্দং আদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥


আমি সেই আদিপুরুষ শ্রীগোবিন্দকে ভজনা করি, যিনি চিন্তামণি রত্নে নির্মিত ধামে বিরাজমান, যেখানে অসংখ্য কল্পবৃক্ষ পরিবেষ্টিত রয়েছে। তিনি সুরভী গাভীদের পালন করেন এবং অসংখ্য  লক্ষ্মীদেবী গভীর ভক্তি ও সম্ভ্রমের সঙ্গে তাঁর সেবা করেন।

বেণুং ক্বণন্তম্ অরবিন্দ-দলায়তাক্ষং
বর্হাবতংসম্ অসিতাম্বুদ-সুন্দরাঙ্গম্ ।
কন্দর্প-কোটি-কমনীয়-বিশেষ-শোভং
গোবিন্দং আদিপুরুষং তমহং ভজামি ॥

আমি সেই আদিপুরুষ শ্রীগোবিন্দকে ভজনা করি, যিনি মধুর বেণুবাদন করছেন, যাঁর নয়ন পদ্মপত্রের ন্যায় বিস্তৃত ও সুন্দর, মস্তকে ময়ূরপঙ্খ শোভা পাচ্ছে,যাঁর শরীর নবঘন মেঘের মতো শ্যামবর্ণ ও অতুল সুন্দর,এবং যাঁর অপরূপ রূপ কোটি কোটি কামদেবের সৌন্দর্যকেও ম্লান করে দেয়।

এই একটি শ্লোকেই ভক্তি, দর্শন ও পরম সত্যের অসাধারণ সমন্বয় প্রকাশ পেয়েছে। যতবার এই শ্লোক উচ্চারণ করা হয়, ততবার হৃদয়ে ভক্তি, শান্তি ও ঈশ্বরচেতনার সঞ্চার ঘটে। এই শ্লোকের অপূর্ব, মধুর ও চিরন্তন ভাবার্থকে আমি আমার কোটি কোটি প্রণাম জানাই। যে শ্লোকে শ্রীগোবিন্দের দিব্য রূপ, অনন্ত করুণা ও অপ্রাকৃত সৌন্দর্যের বর্ণনা ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই ভক্ত হৃদয়কে প্রেম ও ভক্তিতে পরিপূর্ণ করে তোলে।

শ্রীকৃষ্ণ যিনি বেণুবাদক, গোপাল, আদিপুরুষ, সর্বকারণের কারণ , তাঁর চরণে অনন্ত প্রণাম।

॥ হরে কৃষ্ণ ॥


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দেবী পীঠকথা (Devi Peeth Katha)

  ভূমিকা : || একান্ন পীঠে মহামায়ার চিরন্তন বিস্তার ||   “ ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম , আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে …”— এই কাব্যিক অনুভূতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গভীরতা। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল একান্ন শক্তিপীঠ , যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয় , বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও চেতনার এক অমূল্য প্রতীক। পুরাণ মতে , দেবী সতী - র দেহাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়েছিল , যখন ভগবান শিব তাঁর প্রিয়াকে কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছিলেন। সেই দেহাংশের প্রতিটি পতনস্থলই পরবর্তীকালে শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়। মোট ৫২টি এই পবিত্র স্থান ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে , এমনকি ভারতবর্ষের বাইরেও — যার মধ্যে একটি পীঠ গুপ্ত বা অপ্রকাশিত বলেও ধরা হয়। যেখানে প্রতিটি পীঠ মায়ের এক একটি রূপ ও শক্তির প্রতীক। এই শক্তিপীঠগুলির মধ্যে চারটি “ আদি শক্তিপীঠ ” বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে — অসমের কামরূপ কামাখ্যা মন্দির , উত্কলের বিমলা মন্দির , কলকাতার কালিঘাট কালী মন্দ...
  শিবপুরাণ অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের কাহিনি শিব পুরাণ অনুযায়ী শক্তিপীঠের সৃষ্টি শুধুমাত্র সতীর দেহাংশ পতনের একটি পৌরাণিক ঘটনা নয় ; এটি গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। শক্তিপীঠ কেবল ভৌগোলিক স্থান নয় ; এগুলি দেবীশক্তির প্রকাশকেন্দ্র। সতীর দেহের প্রতিটি অংশ মহাশক্তির বিভিন্ন রূপকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। শক্তি ও শিব অবিচ্ছেদ্য, শিব চেতনার পরম তত্ত্ব , আর দেবী সতী সেই চেতনার শক্তিরূপ।   শিব   ও   শক্তি   পরস্পর   অবিচ্ছেদ্য। শিবপুরাণে বর্ণিত আছে যে, প্রজাপতি দক্ষ ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। তাঁর কন্যা সতী, মহাদেব শিবকে স্বামীরূপে গ্রহণ করলেও দক্ষ কখনও শিবকে সম্মান করতেন না। কারণ শিব ছিলেন বৈরাগী, ভস্মমণ্ডিত, অলৌকিক স্বভাবের দেবতা— যা দক্ষের রাজসিক অহংকারের সঙ্গে মেলে না। একসময় প্রজাপতি দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে দেবতা, ঋষি ও গন্ধর্বসহ সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শিব ও সতীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কৈলাসে বসে দেবী সতী যখন দেবতাদের যজ্ঞে যেতে দেখলেন, তখন তাঁ...
|| আজকের জীবনে শক্তিপীঠের সঙ্গে সম্পর্ক ||  শক্তিপীঠের মূল কাহিনি হলো শোক , বিচ্ছেদ এবং পুনর্গঠন। সতীর দেহত্যাগ, মহাদেবের গভীর শোক, সেই শোক থেকে নতুন তীর্থের সৃষ্টি,   মানুষের জীবনেও সম্পর্কভঙ্গ , মৃত্যু , ব্যর্থতা বা মানসিক আঘাত আসে। শক্তিপীঠের কাহিনি মনে করিয়ে দেয় জীবনের ভাঙনও নতুন অর্থ , শক্তি এবং আত্মজাগরণের উৎস হতে পারে। আবার অন্য দিকে আমরা দেখতে পাই ... “ শক্তি ” মানে সৃষ্টিশীল শক্তি , সাহস , জ্ঞান , করুণা ও রূপান্তরের ক্ষমতা। শক্তিপীঠ আমাদের মনে করায় যে নারীত্ব কেবল সামাজিক ভূমিকা নয় ; তা মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক। তাই নারী সম্মান, নারী শিক্ষা , আত্মমর্যাদা , সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব থাকা খুব জরুরি। পরিশেষে বলা বাহুল্য , আজকের জীবনে শক্তিপীঠের গুরুত্ব মূলত আধ্যাত্মিক , প্রতীকী এবং সাংস্কৃতিক। এগুলিকে কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনার স্মারক হিসেবে নয় , বরং মানুষের অন্তর্জীবনের গভীর সত্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে শক্তিপীঠের দর্শন নারীত্বকে মহাশক্তির রূপে প্রতিষ্ঠা করে। এ...