সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শরতে জাগ্রত চণ্ডী

||শরতে জাগ্রত চণ্ডী ||


দূর থেকে অপার এক সৌন্দর্য, যা ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই বড় কঠিন। পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে নীল আকাশ জুড়ে, কাশফুলের শুভ্র ঢেউ যেন প্রকৃতির নিজস্ব অলংকার হয়ে উঠেছে। দূর দিগন্তের ওপার থেকে খুব ধীরে ধীরে ভেসে আসছে ঢাকের বাদ্য—সুমিষ্ট শরতের বাতাসের সঙ্গে মিশে সেই সুর এসে নিঃশব্দে স্পর্শ করে যায় হৃদয়কে। মনে করিয়ে দেয় সেই প্রাচীন রাজবাড়ির কথা, যেখানে প্রতি বছর মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় দেবী চণ্ডীর পূজা।

সময়ের বহু অধ্যায় পেরিয়েও আজও যেন সেই রাজবাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি অলিন্দ বহন করে চলেছে ইতিহাসের গন্ধ। সন্ধ্যার আলোর মৃদু আভায় যখন রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে একে একে জ্বলে ওঠে প্রদীপ, তখন মনে হয় যেন অতীত আর বর্তমান মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ঢাকের তালে, শঙ্খধ্বনির পবিত্র সুরে আর ভক্তদের উচ্ছ্বাসে চারপাশ হয়ে ওঠে এক অলৌকিক অনুভূতির আধার।

দেবী চণ্ডী হিন্দু ধর্মে শক্তির এক মঙ্গলময় রূপ হিসেবে পূজিতা। তিনি আদ্যাশক্তি মহামায়ারই এক প্রকাশ, যিনি অসুর শক্তির বিনাশ এবং ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন। মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত “শ্রীশ্রী চণ্ডী” বা “দেবী মহাত্ম্যম”-এ দেবী চণ্ডীর মহিমা, শক্তি ও অসুরবধের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে।

বিশ্বাস করা হয়, যখন পৃথিবীতে অশুভ শক্তির আধিক্য বেড়ে যায় এবং দেবতারা অসহায় হয়ে পড়েন, তখন দেবী চণ্ডী বিভিন্ন রূপ ধারণ করে অসুরদের বিনাশ করেন। মহিষাসুর, শুম্ভ-নিশুম্ভ কিংবা রক্তবীজের মতো ভয়ংকর অসুরদের বধ করে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যায় ও ধর্মের জয়। দেবী চণ্ডী শুধু ধ্বংসের প্রতীক নন, তিনি মাতৃশক্তিরও প্রতীক। ভক্তদের কাছে তিনি একদিকে যেমন ভয়ংকর রণচণ্ডী, অন্যদিকে তেমনি স্নেহময়ী জননী। তাঁর আশীর্বাদে জীবনের অন্ধকার দূর হয়, মনে জাগে সাহস, শক্তি ও আত্মবিশ্বাস।

এই পূজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি এক আবেগ, এক ঐতিহ্য, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে রয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই রাজবাড়ির দেবী চণ্ডীর দর্শন পেতে—কারণ বিশ্বাস আছে, এই পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগণিত মানুষের আশা, ভক্তি ও অলৌকিক অনুভূতির গল্প।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

দেবী পীঠকথা (Devi Peeth Katha)

  ভূমিকা : || একান্ন পীঠে মহামায়ার চিরন্তন বিস্তার ||   “ ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম , আমরা রয়েছি সেই সূর্যের দেশে …”— এই কাব্যিক অনুভূতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের গভীরতা। সেই ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল একান্ন শক্তিপীঠ , যা শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয় , বরং ভারতীয় সংস্কৃতি ও চেতনার এক অমূল্য প্রতীক। পুরাণ মতে , দেবী সতী - র দেহাংশ পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়েছিল , যখন ভগবান শিব তাঁর প্রিয়াকে কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করছিলেন। সেই দেহাংশের প্রতিটি পতনস্থলই পরবর্তীকালে শক্তিপীঠ হিসেবে পরিগণিত হয়। মোট ৫২টি এই পবিত্র স্থান ছড়িয়ে রয়েছে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে , এমনকি ভারতবর্ষের বাইরেও — যার মধ্যে একটি পীঠ গুপ্ত বা অপ্রকাশিত বলেও ধরা হয়। যেখানে প্রতিটি পীঠ মায়ের এক একটি রূপ ও শক্তির প্রতীক। এই শক্তিপীঠগুলির মধ্যে চারটি “ আদি শক্তিপীঠ ” বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে — অসমের কামরূপ কামাখ্যা মন্দির , উত্কলের বিমলা মন্দির , কলকাতার কালিঘাট কালী মন্দ...
  শিবপুরাণ অনুযায়ী দক্ষযজ্ঞের কাহিনি শিব পুরাণ অনুযায়ী শক্তিপীঠের সৃষ্টি শুধুমাত্র সতীর দেহাংশ পতনের একটি পৌরাণিক ঘটনা নয় ; এটি গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। শক্তিপীঠ কেবল ভৌগোলিক স্থান নয় ; এগুলি দেবীশক্তির প্রকাশকেন্দ্র। সতীর দেহের প্রতিটি অংশ মহাশক্তির বিভিন্ন রূপকে প্রতীকীভাবে প্রতিষ্ঠা করে। শক্তি ও শিব অবিচ্ছেদ্য, শিব চেতনার পরম তত্ত্ব , আর দেবী সতী সেই চেতনার শক্তিরূপ।   শিব   ও   শক্তি   পরস্পর   অবিচ্ছেদ্য। শিবপুরাণে বর্ণিত আছে যে, প্রজাপতি দক্ষ ব্রহ্মার মানসপুত্র এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। তাঁর কন্যা সতী, মহাদেব শিবকে স্বামীরূপে গ্রহণ করলেও দক্ষ কখনও শিবকে সম্মান করতেন না। কারণ শিব ছিলেন বৈরাগী, ভস্মমণ্ডিত, অলৌকিক স্বভাবের দেবতা— যা দক্ষের রাজসিক অহংকারের সঙ্গে মেলে না। একসময় প্রজাপতি দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে দেবতা, ঋষি ও গন্ধর্বসহ সকলকে নিমন্ত্রণ করা হয়, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে শিব ও সতীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কৈলাসে বসে দেবী সতী যখন দেবতাদের যজ্ঞে যেতে দেখলেন, তখন তাঁ...
|| আজকের জীবনে শক্তিপীঠের সঙ্গে সম্পর্ক ||  শক্তিপীঠের মূল কাহিনি হলো শোক , বিচ্ছেদ এবং পুনর্গঠন। সতীর দেহত্যাগ, মহাদেবের গভীর শোক, সেই শোক থেকে নতুন তীর্থের সৃষ্টি,   মানুষের জীবনেও সম্পর্কভঙ্গ , মৃত্যু , ব্যর্থতা বা মানসিক আঘাত আসে। শক্তিপীঠের কাহিনি মনে করিয়ে দেয় জীবনের ভাঙনও নতুন অর্থ , শক্তি এবং আত্মজাগরণের উৎস হতে পারে। আবার অন্য দিকে আমরা দেখতে পাই ... “ শক্তি ” মানে সৃষ্টিশীল শক্তি , সাহস , জ্ঞান , করুণা ও রূপান্তরের ক্ষমতা। শক্তিপীঠ আমাদের মনে করায় যে নারীত্ব কেবল সামাজিক ভূমিকা নয় ; তা মহাজাগতিক শক্তির প্রতীক। তাই নারী সম্মান, নারী শিক্ষা , আত্মমর্যাদা , সৃজনশীলতা ও নেতৃত্ব থাকা খুব জরুরি। পরিশেষে বলা বাহুল্য , আজকের জীবনে শক্তিপীঠের গুরুত্ব মূলত আধ্যাত্মিক , প্রতীকী এবং সাংস্কৃতিক। এগুলিকে কেবল একটি পৌরাণিক ঘটনার স্মারক হিসেবে নয় , বরং মানুষের অন্তর্জীবনের গভীর সত্যের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। একই সঙ্গে শক্তিপীঠের দর্শন নারীত্বকে মহাশক্তির রূপে প্রতিষ্ঠা করে। এ...